গত ২৯শে আগষ্ট ২০১৬, শ্রীপুর গ্রামের দু’জন যুবক দেওয়ানপাশা গ্রামের রাম মোরদ সোনারের বাড়ীতে ৪০ ফুট গভীর নলকূপ (কোয়া) পরিষ্কার করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা প্রান রক্ষার করুন আর্তনাদ করার পরও অপারদর্শী প্রশাসনের নিসক্রিয় ভূমিকার দরুন অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

রাজ্যে নিত্যদিন ঘটে যাওয়া আর দশটি ঘটনার মত এই ঘটনাটিকেও নিচক একটি দুর্ঘটনা ভেবে অথবা আমরা যারা নিয়তিতে বিশ্বাস করি তাঁরা এই ঘটনাটিকে নিয়তির নির্মম পরিহাস ভেবে এড়িয়ে যেতে পারি। অথবা দু’দিন এই ঘটনাটিকে নিয়ে রাজনৈতীক দোষারোপ করে অল্প বিস্তর সহমর্মিতা প্রদর্শন করে তৃতীয় দিন ঘটনাটিকে ভুলে যাওয়া যেতে পারে, তাতে দোষের কিছু আছে বলে আমার মনে হয়না, কারন আজ-কাল আমরা এই কালচার্ডেই অভ্যস্ত। জীবনের পন্থশালায় কত লোক রোজ মরছে, তাতে “আমার কি?” এই কথা বলে যদি এড়িয়ে যেতে নাপারি তবে এই মাহাশুন্যে নিজেকে খাপছাড়া বলে মনে হয়। যদিও জীবন কোন একটি ঘটনার জন্য থেমে থাকেনা, কিন্তু অতীত এবং বর্তমান থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয় তাহলে ভবিষৎ যে ভয়ানক তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

২৯ আগষ্টের ঘটনাটি যেমন সকল স্তরের জনগণকে মর্মাহত করেছে, ঠিক তেমনি আমাকেও বাধ্য করেছে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে। বেশ কিছুদিন থেকে বেশকিছু সরকারি নথিপত্র ঘাটা-ঘাটি করে বেশ কিছু আশ্চর্য করে দেবার মত তথ্য উঠে এসছে। সেইসব তথ্যের ভিত্তিতে রাজ্যের বহুল প্রচলিত সংবাদ মাধ্যম গুলি যদিও সাড়া জাগানো সংবাদ প্রতিবেদন করেছেন, তথাপিও বেশ কিছু তথ্য হয়ত কোন বিশেষ কারনে অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। আমি আমার ব্যক্তিগত মতাম
বিগত অক্টোবর ২০১২ সালে, Directorate General NDRF & Civil Defence (Fire), Ministry of Home Affairs, Government of India কতৃক সমগ্র ভারতবর্ষের ফায়ার সার্বিস এর উপর “Fire Hazard and Risk Analysis” শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, যাতে বলা হয় যে সমগ্র দেশের ১২টি রাজ্য সিমিক জোন এর ফেইস –IV আছে। তার মধ্যে সমগ্র ত্রিপুরা রাজ্য সিমিক জোন এর ফেইস –IV ও V আছে। ১৮৩ পাতার ঐ রিপোর্টে ত্রিপুরা ডিজাস্টার ম্যানেজম্যন্ট ও ত্রিপুরা ফায়ার সার্বিস এর বর্তমান পরিকাঠামো ও ভবিষৎ প্রনালি নিরূপণ করে বিস্তারিত রিপোর্ট ত্রিপুরা সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। সেই রিপোর্টে যে কয়টি বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে পাঁচটি বিষয় আমি এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি :
১। ত্রিপুরা ফায়ার এক্ট দ্রুত কার্যকর করা ও ছোট-বড় সব ধরনের সরকারি ও বেসরকারি নির্মান কাজ “ জাতীয় নির্মান নিয়মাবলী” মেনে যাতে করা হয় সে ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেবার কথা বলা হয়েছে।
২। সমগ্র রাজ্যের ফায়ার সার্বিসে পর্যাপ্ত লোক নিয়োগ, উপযুক্ত প্রশিষ্কন এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত সামগ্রী দিয়ে ফায়ার সার্বিসকে বলিষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।
৩। Quick Response Team (QRTs) ও Motorcycle with mist sets রাজ্যের সকল ফায়ার ষ্টেশনে প্রদান করার কথা বলা হয়েছে।
৪। রাজ্যের জনসংখ্যার নিরিখে ফায়ার ষ্টেশনের সংখ্যা অনেক কম। তাই জনসংখ্যার নিরিখে নতুন ফায়ার ষ্টেশন ঘটন করার কথা বলা হয়েছে।
৫। যেহেতু ত্রিপুরা রাজ্য সিমিক জোন এর ফেইস –IV ও V পড়েছে, তাই জনসচেতনার সাথে সাথে ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স ও ত্রিপুরা ফায়ার সার্বিসকে আধুনিকীকরণ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষন এবং অত্যাধুনিক সামগ্রী দিয়ে বলিষ্ট ও সদাসক্রিয় করে তুলার কথা বারবার বলা হয়েছে।
এই রিপোর্ট থেকে একটা কথা পরিষ্কার যে, ত্রিপুরায় যেকোন সময় বড় কোন বিপর্যয় ঘটার প্রবল সম্ভাবনা আছে এবং ত্রিপুরায় প্রশিক্ষিত কর্মি ও অত্যাধুনিক সামগ্রীর অভাবে আপাতত হয়ত প্রবল লোকক্ষয় হবার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যাবেনা।

ভারত সরকারের গৃহ মন্ত্রণালয় থেকে অক্টোবর ২০১২ সালে এই রিপোর্ট প্রকাশ করার পর, বিগত বছর গুলিতে যা করা হয়েছে বা বর্তমানে যা যা করা হচ্ছে তাতে থেকে আপাতত একটি বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ভারত সরকার বিপর্যয় মুকাবিলা নিয়ে সচেতন থাকলেও আমাদের ত্রিপুরা রাজ্য প্রশাসন যে কুম্ভ কর্ণের নিদ্রায় বিরাজমান আছেন সে বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। তা নাহলে রিপোর্ট প্রকাশ হবার চার বছর পরও দু’জন যুবককে মাত্র ৪০ ফুট গভীর নলকূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করতে রাজ্য প্রশাসন ব্যর্থ হবার কারন কি? আপাতত আমি এই বিষয়ে নিশ্চিত যে, কোন বড় বিপর্যয়ে ধ্বংস লীলা দেখা ছাড়া রাজ্য প্রশাসন কিছুই করতে পারবে না।

এখন সব থেকে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, বিগত ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ আর্থিক সাহায্য রাজ্য সরকারকে দেওয়া হয়েছে সেই অর্থ কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে। কারন ভারত সরকারের গৃহ মন্ত্রণালয় কতৃক ২০১৫ সাল পর্যন্ত যে আর্থিক পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে সেই মোতাবেক বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য নিম্ন লিখিত খাতে প্রায় ১২৯ কোটি টাকারও বেশী অর্থ রাজ্য সরকারকে দেওয়া হয়েছে । অতছ রাজ্যের বাস্তব চিত্র অন্য কথাই বলছে।
 ১। State Disaster Response Fund  Rs. 106.7 Cr.
২। Capacity Building for Disaster Response Rs. 05.00 Cr.
৩। Fire Service Revamping Grant Rs. 15.00 Cr.
৪। Fire Service Development Grant Rs. 3.40 Cr.

স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কোন যোগে বসবাস করছি? কিসের স্বার্থে মিথ্যে দিয়ে সন্মোকবর্তী বিপর্যয়কে আড়াল করতে চেষ্টা করা হচ্ছে? এভাবে কি ভবিষৎ বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করা সম্ভব? যদি তাই নাহয়, তাহলে আর কতদিন প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারনে ঘটে যাওয়া মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে আক্ষায়িত করে পার পেয়ে যাবার চেষ্টা চলবে?

Spread the love

One thought on “২৯শে আগষ্টের ঘটনাটি কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা?